পর্যায় সারণি

পর্যায় সারণি: পর্যায় সারণি বা রাসায়নিক মৌলের পর্যায়-সারণি (Periodic table of the elements) রসায়নের অত্যন্ত যুগান্তকারী একটি আবিষ্কার। পর্যায়-সারণি ছাড়া কোনভাবেই রসায়ন অধ্যয়ন সম্ভব নয়।

পর্যায় সারণি মূলত মৌলিক পরমাণু সমূহ নিয়ে গঠিত একটি টেবিল। পর্যায়-সারণিতে মৌলগুলো তাদের পারমানবিক সংখ্যার ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়েছে। তবে, পর্যায়-সারণির মূল ভিত্তি ইলেকট্রন বিন্যাস।

 

পর্যায় সারণি

[ পর্যায় সারণি ]

পর্যায় সারণি একটি বিস্তৃত ও বিস্তারিত তথ্যভিত্তিক টেবিল যেখানে মৌলসমূহের অসংখ্য ধর্মকে একটি সিরিজের মেলবন্ধনে যুক্ত করা হয়েছে। উপরের চিত্রে একটি বিস্তারিত তথ্যসহ পর্যায়-সারণি দেখানো হয়েছে। বর্তমানের এই পর্যায়-সারণিকে আধুনিক পর্যায়-সারণি বলা হয়।

পর্যায় সারণির বাম থেকে ডানে ভূমির সমান্তরালের রো গুলোকে Row বা Period বলা হয়। একটি মৌলের ইলেকট্রনগুলো যতগুলো অরবিট এর মাঝে বিন্যস্ত থাকে, পর্যায়-সারণিতে সেই মৌল তত তম পর্যায় (Period) এ অবস্থান লাভ করেছে।
যেমন, Na (সোডিয়াম) এর ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 1. অর্থাৎ, Na এর মোট অরবিট সংখ্যা তিনটি। এজন্য Na পর্যায়-সারণির Period- 3 তে অবস্থান লাভ করেছে। আবার পটাশিয়াম (K) এর পারমানবিক সংখ্যা 19. K এর ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 8, 1 ; অর্থাৎ, K এর অরবিট সংখ্যা চারটি। একইভাবে, ক্যালসিয়াম (Ca) এর ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 8, 2 ; K এর মত Ca ও চারটি অরবিট নিয়ে গঠিত মৌল। একারণে, পর্যায়-সারণিতে K এবং Ca কে পাশাপাশি period- 4 এ দেখতে পাওয়া যায়।

1869 সালে বিজ্ঞানী Dmitri Mendeleev প্রথম মৌলগুলোর ধর্মে মিল দেখতে পান এবং একটি পর্যায়-সারণি তৈরি করেন। ম্যান্ডেলিভের হাতে লেখা পর্যায় সারণির একটি চিত্র নিচে লক্ষ্য করুনঃ

 

 

আজকের পর্যায় সারণি মূলত চারটি বড় ব্লকে বিভক্ত। এগুলো মৌলগুলোর সর্বশেষ ইলেকট্রন কোন অরবিটালে প্রবেশ করেছে, তার উপর নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্লকগুলো হলো s, p, d, এবং f



উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বাম পাশে সবুজ রঙ দিয়ে মার্ককৃত s ব্লক, ডান পাশে লাল রঙ দিয়ে p ব্লক, মাঝে হলুদ রঙ দিয়ে d এবং নীচে আকাশী রঙ f ব্লককে নির্দেশ করছে। একইসাথে, সর্বশেষ শক্তিস্তরের ইলেকট্রন কোন অরবিটালে প্রবেশ করেছে, সেটিও লিখা রয়েছে।

তবে, পর্যায় সারণির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নির্দেশ করে পর্যায়-সারণির গ্রুপগুলো। উপর থেকে নীচে মোট 18 টি vertical column রয়েছে, যেগুলোকে গ্রুপ বলে। বাম থেকে 1 নং গ্রুপ হিসাব করে পর্যায়ক্রমে সর্বডানে 18 নং গ্রুপ পাওয়া যায়। 18 নম্বর গ্রুপটি নিষ্ক্রিয় মৌল (Inert gases) এর গ্রুপ। খেয়াল করলে দেখা যায়, সকল নিষ্ক্রিয় মৌল p ব্লকের অন্তর্ভুক্ত। তবে, He দুইটি ইলেকট্রন নিয়ে 18 নং গ্রুপে অবস্থান করে। অথচ, He এর ইলেকট্রন বিন্যাস 1s2 . s ব্লক মৌল হওয়ার পরেও নিষ্ক্রিয় বিধায় He কে গ্রুপ 18 তে রাখা হয়েছে।

গ্রুপ 1 কে (ক্ষার) Alkali এবং গ্রুপ 2 কে (মৃৎ ক্ষার) Alkaline Earth metal group বলা হয়। গ্রুপ 11 কে কয়েন মেটাল গ্রুপ বলা হয়। নিচের চিত্রে পর্যায়-সারণির গ্রুপগুলোর নাম চিহ্নিত করে দেওয়া হলো।

 

 

গ্রুপ 16 কে চ্যালকোজেন এবং গ্রুপ 17 কে হ্যালোজেন গ্রুপ বলা হয়। কেননা, 17 গ্রুপের সবাই হ্যালাইড লবণ উৎপন্নকারী।
পর্যায় সারণির নীচের দুইটি পর্যায় মূলত period 6 এবং 7 এর অংশ। তারা group- 3 এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু গ্রুপ 3 এর সাথে মিলিয়ে পর্যায় তৈরি করতে সমস্যা হওয়ায় তাদের নীচে স্থান দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে তারা f ব্লক মৌল বিধায় আলাদা রেখে তাদের ব্লক আলাদা করে দেখানো গেছে।

যদি 3d ছবি একে সবসময় পর্যায়-সারণি উপস্থাপন সম্ভব হতো তাহলে হয়তো La এবং Ac গ্রুপ সহ পর্যায় সারণি নীচের চিত্রের মতো হতোঃ

এই চিত্র থেকে বোঝা যায় যে, ল্যান্থেনাইড ও এক্টিনাইড আসলে পর্যায় 6 ও 7 এর অংশ এবং তারা গ্রুপ 3 এ অবস্থান করে।
পর্যায় সারণি পড়ার নিয়ম বাম থেকে ডানে। মাঝে কোন পরমাণু না থাকলেও পারমানবিক সংখ্যার সিরিয়াল মিলাতে বাম থেকে ডানে পাশাপাশি পড়লে পারমানবিক সংখ্যা অনুযায়ী মৌল খুঁজে পাওয়া যাবে। যেমন, H ও He এর মাঝে কোন পরমাণু নাই। কিন্তু, একটি সর্ব্ বামে, আরেকটি সর্বডানে। পড়ার সময় বাম থেকে ডানে পড়লে পারমানবিক সংখ্যার সিরিয়াল 1, 2 মিলবে। এবার নীচের সারিতে চলে এসে আবার বাম থেকে ডানে পড়তে হবে।

তবে গ্রুপ, বৈশিষ্ট ইত্যাদি জানতে গ্রুপ ধরে বা জিগজ্যাগ পদ্ধতিতেও পড়া যেতে পারে।
পর্যায় সারণি মৌলগুলোর ব্যাসার্ধ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়।



পর্যায় সারণির বাম থেকে ডানে গেলে ব্যাসার্ধ ছোট হতে থাকে, কেননা শক্তিস্তরের পরিমান একই থাকে, কিন্তু ইলেকট্রনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। আবার উপর থেকে নীচে ব্যাসার্ধ বড় হতে থাকে, কারণ কক্ষপথ সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। উপরের চিত্রে পর্যায়-সারণির মৌলগুলোর ব্যাসার্ধ দেখানো হয়েছে।

পর্যায় সারণির বাম থেকে ডান, ডান থেকে বাম, কোনাকোণি, উপর থেকে নীচে বা নীচে থেকে উপরে গেলে অনেক ধর্মের পরিবর্তন হয়। নীচে একটি চিত্রের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন দেখানো হলো।

আধুনিক পর্যায় সারণি ইলেকট্রন বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। পর্যায়-সারণি নিয়ে রসায়নে অনেক তত্ত্ব, অনেক নিয়ম এবং অনেক গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে পর্যায়-সারণির সাথে মৌলের বিভিন্ন বৈশিষ্টের পরিবর্তন নিয়ে ChemistryGOLN.com এ সামনে আরো আর্টিকেল প্রকাশিত হবে।

চিত্রে পর্যায় সারণিতে প্রতিটি মৌলের সর্বশেষ শক্তিস্তরের ইলেকট্রন বিন্যাস দেখানো হয়েছে।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন