পরমাণু ও ইলেকট্রন বিন্যাস ১

পরমাণু ও ইলেকট্রন বিন্যাস ১ : ইলেকট্রন বিন্যাস বা ইলেকট্রন কনফিগারেশন (Electron Configuration) রসায়নের (Chemistry) যে কোন জ্ঞান অর্জনের পূর্বশর্ত। ইলেকট্রন বিন্যাস হচ্ছে রসায়নের জ্ঞানের ভিত্তি। পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক হলো এটম (Atom) । বাংলায় আমরা এটমকে পরমাণু বলি। পদার্থের মৌলিক কণা এটম বা পরমাণুকে ঘিরেই বিস্তৃত হতে থাকে রসায়নের জ্ঞানের পরিধি।

পরমাণুর যে কোন বৈশিষ্ট সহজে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে ইলেকট্রন বিন্যাস জানা জরুরী। ইলেকট্রন বিন্যাস হলো একটি পরমাণুর ভেতরে অবস্থিত ইলেকট্রনসমূহ কী ধরণের গাণিতিক (Numeric) বিন্যাসে ঐ পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরছে তার উপস্থাপন। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রনগুলো কেন ঘুরছে?

ইলেকট্রনের ঘূর্ণন বুঝতে হলে আমরা প্রচলিত রাদারফোর্ড বা বোরের পরমাণু মডেল দিয়ে আজকে এটিকে ব্যাখ্যা করব না। রাদারফোর্ড বা বোরের পরমাণু মডেল বা প্রচলিত বোঝানোর পদ্ধতি অনুসরণ না করেও ইলেকট্রন এর ঘূর্ণন বোঝা সম্ভব। এজন্য প্রথমে নিচের চিত্রটি লক্ষ্য করি।

পরমাণু ও ইলেকট্রন বিন্যাস ১

[ পরমাণু ও ইলেকট্রন বিন্যাস ১ ]

এটি একটি আনুপাতিক চিত্র যেখানে প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেক্ট্রনের আকার (নির্দিষ্ট স্কেলে) এবং প্রকৃত ভর লেখা আছে। এই চিত্রকে আরো সহজ করলে কেমন হয়?

দেখা যাচ্ছে একটি প্রোটনের আকার এবং একটি নিউট্রনের আকার সমান। এদের ভরও প্রায় সমান (প্রথম চিত্র)। কিন্তু একটি ইলেকট্রন একটি নিউক্লিয়াসের তুলনায় আকারে এবং ভরে অনেক বেশি ক্ষুদ্র। প্রোটন বা নিউট্রনের চেয়ে 1840 ভাগের 1 ভাগ ভর মাত্র একটি ইলেকট্রনে অবস্থিত থাকে।

ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন কীভাবে একটি পরমাণুতে অবস্থান করে?



চিত্রটি থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রোটন এবং নিউট্রন একত্রে নিউক্লিয়াসে অবস্থান করছে। বলে রাখা ভাল, আমরা যেগুলোকে ইলেকট্রনের কক্ষপথ বা অরবিট বলি, সেগুলো আসলে ইলেকট্রন মেঘ (Electron cloud)। তবে ইলেকট্রন ক্লাউড নিয়ে আমরা শুরুতেই ব্যাখ্যা করব না, বোঝার সুবিধার্থে এখন এগুলোকে শক্তিস্তর বা কক্ষপথ ধরেই ইলেকট্রন বিন্যাস বর্ণনা করব।
নিউক্লিয়াস এবং ইলেকট্রন ক্লাউড / ইলেকট্রনের কক্ষপথগুলোর মাঝে একটা অনেক বড় ফাকা জায়গা থাকে।

চার্জের কারণে ইলেকট্রন এবং প্রোটন বা নিউক্লিয়াস একে অন্যকে আকর্ষণ করে। কিন্তু, আমরা জানি, আকর্ষণ বলের ক্ষেত্রে ভর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। নিউক্লিয়াসে প্রোটন এবং নিউট্রন মিলে যে ভরে ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করে, ইলেকট্রনের ভর তার কাছে কিছুই না। এজন্য ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘুরতে থাকে, কিন্তু কেন্দ্রে পতিত হয় না। কারণ, তার নিজের ভর দিয়ে সে প্রোটনকেও আকর্ষণ করে, অর্থাৎ একটি বিপরীত আকর্ষণ বল তৈরি হয় কিন্তু ইলেকট্রন ভরের স্বল্পতার কারণে ঘোরা শুরু করে।

ঠিক আমাদের চাঁদ ও পৃথিবী অথবা পৃথিবী ও সূর্যের মত। এভাবে যদি কেন্দ্রে সব ভর রেখে কোন বস্তু বাইরে বের হতে চায়, আবার কেন্দ্র তাকে আকর্ষণ করাও বন্ধ না করে, তাহলে বস্তুটি তখন কেন্দ্র বা ভরকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকবে। নিচের ছবিতে বিষয়টি আরো ভালভাবে বুঝা যাবে।

উপরের ছবিটি একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর। কিন্তু এটি তো কাল্পনিক চিত্র বা অঙ্কিত চিত্র মাত্র। পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস করার আগে কেমন হয় যদি হাইড্রোজেন পরমাণুর একটি বাস্তব ছবি দেখা যায়?
নিচের চিত্রটি দেখা যাক তাহলে।



নেদারল্যান্ডের বিজ্ঞানী Aneta Stodolna, যিনি FOM Institute for Atomic and Molecular Physics (AMOLF) এর একজন বিজ্ঞানী, তিনি ও তার সহকর্মীরা একটি “quantum microscope” আবিষ্কার করেছেন এবং সেই মাইক্রোস্কোপ দিয়ে উপরের ছবিটি তোলা হয়েছে। এই ছবিটি একটি বাস্তব হাইড্রোজেন পরমাণু বা Atom এর, যেখানে কেন্দ্রে নিউক্লিয়াস (প্রোটন ও নিউট্রন) এবং বাহিরে গোল ইলেকট্রন মেঘের দেখা মিলেছে। মাঝে বিশাল একটি জায়গা ফাকা দেখা যাচ্ছে।
এখন তাহলে ভরকেন্দ্রকে ঘিরে গোল হয়ে ঘুরে বেড়ানো ইলেকট্রনদের বিন্যাস লক্ষ্য করা যাক।

ইলেকট্রনগুলো স্তরে স্তরে বিন্যস্ত হয়ে ঘুরুতে থাকে, এভাবে প্রথম স্তর ও কেন্দ্রের ব্যাসার্ধ (Radius) বেশ ছোট হয়, ফলে পরিধিও ছোট হয়। পরের কক্ষপথ বা Orbit গুলো আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। অরবিটগুলোকে 1, 2, 3, 4 , 5 , 6, 7 এভাবে নির্দেশ করা হয়, আবার K, L, M, N এভাবেও নির্দেশ করা হয়। প্রথম কক্ষপথে সর্বোচ্চ দুইটি ইলেকট্রন থাকতে পারে। এটি নির্ধারিত হয় 2n2 সূত্রমতে। এখানে n= কক্ষপথ এর নম্বর (1,2,3,4 ইত্যাদি)।

তাহলে 2য় কক্ষপথে ইলেকট্রন থাকবে 2 x (2)2 = 8 টি। তৃতীয় স্তরে 18 টি ইলেকট্রন থাকবে।
এভাবে পটাশিয়াম (K) এর ইলেকট্রন বিন্যাসের চিত্র কেমন হবে সেটি দেখা যাক। পটাশিয়ামের পারমানবিক সংখ্যা এবং ইলেকট্রন সংখ্যা 19 –

কিন্তু Orbit বা কক্ষপথ দিয়েই কেবল ইলেকট্রন বিন্যাস করা হয় না। ইলেকট্রন বিন্যাস করতে কোয়ান্টাম সংখ্যা এবং বিভিন্ন নীতি প্রয়োজন। আমরা ChemistryGOLN.com এ ধারাবাহিকভাবে ইলেকট্রন বিন্যাস ও এর বিস্তারিত নিয়ে লিখতে থাকব।
এই অরবিটগুলোর ভেতরে বিভিন্ন উপ-শক্তিস্তর বা Orbital থাকে। প্রতিটি অরবিটালের আবার অক্ষ অনুযায়ী ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা ও শক্তি নির্ধারিত হয়।

অরবিটালগুলো হলো s, p, d এবং f ; মোট চারটি।



উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে s অরবিটালের একটিমাত্র ক্ষেত্র (Sub-orbital)। প্রতিটি অরবিটের s অরবিটাল থাকে। একটি sub-orbital এ সর্বোচ্চ দুইটি ইলেকট্রন থাকতে পারে।

P অরবিটালের এমন তিনটি sub-orbital আছে। প্রথম শক্তিস্তরের কোন p অরবিটাল নাই। p অরবিটাল শুরু হয় দ্বিতীয় শক্তিস্তর থেকে। Px, Py, Pz এই তিনটি সাব অরবিটালের প্রতিটি দুইটি করে ইলেকট্রন স্থান দিতে পারে। একইভাবে, তৃতীয় শক্তিস্তর থেকে d অরবিটাল শুরু হয় । d অরবিটালের মোট 5 টি সাব অরবিটাল আছে। এভাবে f অরবিটালের 7 টি সাব অরবিটাল আছে।

বর্ণনামতে, s অরবিটাল 2 টি, p অরবিটাল 6 টি, d মোট 10 টি ও f অরবিটাল 14 টি ইলেকট্রন ধারণ করতে পারবে। তবে f শুরু হবে চতুর্থ অরবিট থেকে।
নিচের ছবিতে f অরবিটালের সাব অরবিটাল গুলো দেখানো হলো।



এখন একটি অরবিটাল ভিত্তিক ইলেকট্রন বিন্যাস দেখা যাক।

আরেকটি ইলেকট্রন বিন্যাস দেখা যাক। Fe-26:



S, p, d, f অরবিটালগুলো এলোমেলো লাগছে? তাহলে চলুন পরের আর্টিকেলে যাওয়া যাক। তখন ইলেকট্রন বিন্যাস আপনার কাছে আর কঠিন মনে হবে না।

“পরমাণু ও ইলেকট্রন বিন্যাস ১”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন